যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরের হ্যান্ডেলিং শ্রমিকদের টনপ্রতি মজুরি ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হেলমেট ও গ্লাভস বিতরণ করেছেন নতুন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড এর পরিচালক মোঃ শহীদ হোসেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বেনাপোল স্থলবন্দরের কাঁচামাল মাঠে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শ্রমিকদের মধ্যে হেলমেট ও গ্লাভস বিতরণ করা হয়।
বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৮৯১-এর সভাপতি মাকসুদুর রহমান রিন্টুর সভাপতিত্বে এবং ৯২৫ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সহিদ আলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন নতুন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মোঃ শহীদ হোসোন।
শ্রমিকদের উদ্দেশে যা বললেন নতুন ঠিকাদার এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস লিমিটেড এর পরিচালক মোঃ শহীদ হোসেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শহীদ হোসেন বলেন, “শ্রমিক বাঁচলে আমরা বাঁচব, আর আমরা বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে”—এই বিশ্বাস নিয়েই আমি কাজ করতে চাই। আপনারা শুধু শ্রমিক নন, আপনারাই এই বন্দরের কাজের মূল চালিকাশক্তি।
তিনি বলেন, আমি জানতে পেরেছি, অতীতে অনেক সময় শ্রমিকরা বিপদে-আপদে যথাযথ সহযোগিতা ও খোঁজখবর পাননি। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই—কাজের পাশাপাশি আপনাদের সুখ-দুঃখ ও বিপদে-আপদেও আমি পাশে থাকব। আপনাদের কোনো সমস্যা হলে আমাকে সরাসরি জানাবেন।
শহীদ হোসেন আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু ঠিকাদারি কাজ করা নয়, বেনাপোল স্থলবন্দরের কাজের গতি আরও বাড়ানো। এ জন্য নতুন ও আধুনিক ক্রেন এবং প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত সরঞ্জাম যুক্ত করা হবে। আপনারা নিরাপদে, মনোযোগ দিয়ে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন। আমরা সবাই মিলে এই বন্দরের কাজের গতি ফিরিয়ে আনতে চাই।
তিনি বলেন, আমি নিজেও শ্রমজীবী মানুষের কষ্ট বুঝি। জীবনে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে কাজ করেছি। তাই শ্রমিকদের ঘাম ও শ্রমের মূল্য আমি বুঝি। আপনাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হবে এবং শ্রমিকদের সঙ্গে মাসে অন্তত একবার বসে তাদের সমস্যা ও দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
তিনি আরও বলেন, আপনারা ভালোভাবে কাজ করুন, কাজে মনোযোগ দিন। আমিও আপনাদের পাশে থেকে কাজ করে যাব। ইনশাআল্লাহ, বেনাপোল স্থলবন্দরকে আরও গতিশীল করতে আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব।
শ্রমিকদের নিরাপত্তায় নতুন উদ্যোগ মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি হেলমেট ও গ্লাভস পেয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সন্তোষ দেখা যায়। শ্রমিকরা বলেন, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিরাপত্তা সরঞ্জাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ঠিকাদার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ায় তারা আশাবাদী।
শ্রমিকরা আরও বলেন, আগের অনেক ঠিকাদার মালিকের সঙ্গে শ্রমিকদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। বিপদে-আপদে খোঁজখবর নেওয়ার বিষয়টিও আমরা সবসময় পাইনি। নতুন ঠিকাদার আমাদের মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি হেলমেট ও গ্লাভস দিয়েছেন। আমরা আমাদের শ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে বন্দরের কাজে সহযোগিতা করতে চাই।
বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৯২৫-এর সভাপতি মো. তবিবুর রহমান তবি বলেন, শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি জানিয়ে আসছেন। নতুন ঠিকাদার শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে টনপ্রতি ২০ টাকা করেছেন এবং নিরাপত্তার জন্য হেলমেট ও গ্লাভস দিয়েছেন—এটি শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক উদ্যোগ।
তিনি বলেন, আমরা চাই শ্রমিকরা নিরাপদে কাজ করবেন, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে এবং বন্দরের কাজের গতি বাড়বে। শ্রমিকদের কল্যাণে ঠিকাদার কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও বন্দরের স্বার্থে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
৯২৫ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোঃ সহিদ আলী বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একজন শ্রমিকবান্ধব নেতা। তিনি বলেছেন, তাঁর নামটা যেন প্রথমে শ্রমিকদের কাতারে লেখা হয়। তাই একজন শ্রমিক নেতা হিসেবে আমিও শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্ট বুঝি। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও মজুরি নিশ্চিত করতে আমি দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি যাতে বেনাপোল স্থলবন্দরে কাজের গতি আরও বাড়ে এবং শ্রমিকরা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পান। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি আমাদের দীর্ঘদিনের দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। আজ টনপ্রতি মজুরি ১৬ টাকা থেকে ২০ টাকা হওয়ায় শ্রমিকরা উপকৃত হবেন।
সহিদ আলী আরও বলেন, শ্রমিকদের সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে আমি সবসময় পাশে ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না। এই বন্দরে কীভাবে আরও বেশি কাজ সৃষ্টি করা যায় এবং শ্রমিকরা কীভাবে ভালোভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে পারেন, সে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, অতীতে বন্দরে কাজের সংকট ছিল, শ্রমিকদের আয়-রোজগারও ছিল অনিশ্চিত। শ্রমিকরা যাতে তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান, সেটিই আমাদের মূল লক্ষ্য। নতুন ঠিকাদার শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়ায় আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই।
৫০ বছরের অভিজ্ঞতায় এমন উদ্যোগ দেখেননি কাশেম আলী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সাবেক লেবাস সরদার কাশেম আলী বলেন, বিগত ৫০ বছরেও শ্রমিকদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ খুব একটা দেখিনি। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার জন্য হেলমেট ও গ্লাভস দেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, ৯২৫ ইউনিয়নের সভাপতি তবিবুর রহমান তবি ও সাধারণ সম্পাদক সহিদ আলী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাদের প্রচেষ্টায় শ্রমিকরা আজ ন্যায্য মজুরি পেয়েছেন। আমরা তাদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাদের সুস্থ রাখেন এবং শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করার তৌফিক দেন।
অনুষ্ঠানে বেনাপোল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক মো. হান্নানসহ বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা, সহকর্মী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় বেনাপোল স্থলবন্দর হ্যান্ডেলিং শ্রমিক ইউনিয়ন ৮৯১- সাধারণ সম্পাদক লিটন হোসেন দপ্তর সম্পাদক শাহাবুদ্দিন ও মোস্ত, ৯২৫ এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মজিদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী ডাক্তার, দপ্তর সম্পাদক আবুল কাশেম, প্রচার সম্পাদক ওমর ফারুক, বন্দর বিষয়ক সম্পাদক আব্বাস আলী, কোষাধ্যক্ষ মোঃ সবুজ হোসেন, সদস্য কামরুজ্জামান,জামির হোসেন, শ্রমিক নেতা হান্নানসহ ইউনিয়ন ৯২৫-এর অন্যান্য নেতাকর্মী ও সাধারণ শ্রমিকরা উপস্থিত ছিলেন।