চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ), ১৯ মে ২০২৬ (প্রেক্ষাপট ডটকম):
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে মূল্যবান সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ চুরির ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে বন বিভাগ ও প্রশাসন। ঘটনাটি তদন্তে মাঠে নেমেছেন বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) দুপুরে মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ বিভাগের প্রতিনিধি ও সহকারী বন সংরক্ষক মির্জা মেহেদী সারওয়ার সাতছড়ির ডুমুরতলা এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মেহেদী হাসান, বন প্রহরী এবং স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে গাছ চুরির বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। ডুমুরতলা এলাকায় কাটা দুটি সেগুন গাছের গোড়া ছাড়াও পাশের আরেকটি স্থানে আরও অন্তত ১০টি গাছ কাটার চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে এসব পুরোনো ঘটনা বলে দাবি করেন বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী হাসান।
তিনি জানান, এসব গাছ তার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই কাটা হয়েছিল।
এদিকে সোমবার রাতে চুনারুঘাট থানা পুলিশ এ ঘটনায় একটি মামলা রুজু করেছে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের গভীর অরণ্য থেকে সংঘবদ্ধ একটি চক্র রাতের আঁধারে ২০ থেকে ২৫টি সেগুনসহ বিভিন্ন মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। গত ৮ মে সরেজমিনে ডুমুরতলা এলাকায় গিয়ে শতবর্ষী দুটি বিশাল সেগুন গাছের কাটা গোড়া, ছড়িয়ে থাকা করাতের গুঁড়া এবং বনজুড়ে অসংখ্য কাটা গাছের চিহ্ন দেখা যায়।
স্থানীয় এক ভিলেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পুরো বন ঘুরে দেখলে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি কাটা গাছের গোড়া পাওয়া যাবে। আগেও বহু গাছ কাটা হয়েছে, যার পুরোনো শিকড় এখনও বিভিন্ন স্থানে পড়ে আছে।
প্রায় ২৪৩ হেক্টর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ২০০৫ সালে এটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা এই বনে রয়েছে সাতটি প্রাকৃতিক ছড়া, যেখান থেকে উদ্যানটির নামকরণ করা হয়েছে। এখানে বিরল প্রজাতির উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বনরুইসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। এছাড়া শতবর্ষী সেগুন, গর্জন, চাপালিশ, করই ও বিভিন্ন ঔষধি গাছ বনটির পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে আসছে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে গাছ কাটার কারণে বনটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গাছ চুরির সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট জড়িত। তাদের দাবি, কাঠচোরদের পাশাপাশি বন বিভাগের অসাধু কিছু কর্মচারী, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের যোগসাজশ ছাড়া এত বড় আকারে গাছ চুরি সম্ভব নয়।
পরিবেশবাদী নেতা তোফাজ্জল সোহেল বলেন, একটি বড় গাছ কাটা মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য প্রাণীর বাসস্থান, পাখির আশ্রয়, মাটির আর্দ্রতা এবং বনজ পরিবেশের ভারসাম্য। এভাবে গাছ কাটা চলতে থাকলে সাতছড়ির জীববৈচিত্র্য ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে।
তিনি আরও বলেন, বন ধ্বংস হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও তীব্র হবে, কমে যাবে বৃষ্টিপাত, বাড়বে ভূমিক্ষয় এবং বিলুপ্ত হবে অনেক বন্যপ্রাণী।
এর আগেও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে একই ধরনের গাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ১৮ জুন “সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সেগুনগাছ কেটে নিল দুর্বৃত্তরা” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও অভিযোগ রয়েছে, তখন কোনো দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে বনখেকো চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে সাতছড়ি রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, দুটি সেগুন গাছ চুরির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ কিছুটা শনাক্ত করতে পেরেছে কারা জড়িত থাকতে পারে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম জানান, তিনি বর্তমানে সরকারি প্রশিক্ষণে রয়েছেন। বিষয়টি এখনও তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।