ঢাকা, ২৭ অক্টোবর ২০২৪ (দৈরাস):
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদায় হলেও এদের নগ্ন হস্তক্ষেপ প্রতিনিয়ত প্রকাশ পাচ্ছে। দৈনিক রাষ্ট্রীয় সংবাদ পত্রিকার অনুসন্ধানে এবার এমনটিই তথ্য মিলেছে খোদ রাজধানীর ডেমরা এলাকায়। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন এলাকায় একাধিক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ নামের আড়ালে মাদক ও পতিতা বাণিজ্যের মূল হোতা ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ’আঙুল ফুলে কলা গাছ’ বনে যাওয়া কালাম হোসেন (৩৮) (ওরফে- জয় খান) এখন ভোল পাল্টিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র ব্যানারে শুরু করেছেন তার পূর্বের অবৈধ কার্যকলাপ।
উক্ত কালাম হোসেন (ওরফে- জয় খান) নারায়নগঞ্জ জেলা, সোনারগাও উপজেলার খং রসাদী গ্রামের আবুবকর সিদ্দিক এর ছেলে। তিনি মূলত নারায়নগঞ্জের মোগড়াপাড়া, যাত্রাবাড়ী ও স্টাফ কোয়াটার, ডেমরায় আবাসিক হোটেল নামের আড়ালে একজন মাদক ও দেহব্যবসায়ী।
সৈরাচারী সরকারের আমলে তাদের রাজনৈতিক ব্যানারে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজের অবৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছিলেন। বর্তমানে সৈরাচারী সরকারের পতনের পর ফের মাদক ও দেহ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিএনপি’র ব্যানারে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রচারণা করে আসছেন।

ছবি : বৈদ্যের বাজার ইউনিয়ন যুবদল ব্যানারে পোস্টারে আওয়ামী লীগপন্থী কালাম হোসেন (ওরফে- জয় খান)।
তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে যাত্রাবাড়ি, ডেমরা ও নারায়নগঞ্জে একাধিক মামলা রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো উঠে আসে, জয় খানের নিজ আপন ভাই মোঃ সোহেল রানা (ওরফে- তাওসিফ সোহেল রানা)ও মাদক ও দেহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। জয় খানের পূর্বে পরিচালনাকৃত যাত্রাবাড়ির আবাসিক হোটেলের আড়ালে মাদক ও দেহব্যবসা এখন সোহেল রানা পরিচালনা করে আসছেন।

ছবি : মাদক ও দেহ ব্যবসায়ী মোঃ সোহেল রানা (ওরফে- তাওসিফ সোহেল রানা)।
জয় খানের ভাই সোহেল রানা বর্তমানে যাত্রাবাড়ী, সোনারগাও ও ডেমরার সাইনবোর্ড এ হোটেলে মাদক ও দেহ ব্যবসায় বেশ সিদ্ধহস্ত।
বিগত ৪ জানুয়ারি ২০২২ দিবাগত রাত আনু: ১টার দিকে কালাম হোসেন (ওরফে- জয় খান) এর পরিচালিত মীরপাড়া, হাজী মির্জা আলী সুপার মার্কেটে ‘ হোটেল ফেসী ইন্ আবাসিক’এ র্যা ব-১০ এর একটি অভিযানে হোটেলটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, পতিতা নারী ও খদ্দেরসহ ৯ জনকে অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার করে। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আবারও পূর্বের ব্যবসায় যুক্ত হন।

ছবি : হোটেল ফেনী ইন্ আবাসিক। ডেমরা থানায় একাধিক মামলা হওয়ার পরে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে।
এরপর, বিগত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ একই নামের হোটেলটি থেকে যৌনকর্মী, খদ্দের ও হোটেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করে ডেমরা থানা পুলিশ। কিছু দিন যেতে না যেতে তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আবারও পূর্বের ব্যবসায় যুক্ত হন। তবে হোটেলটির পরিচালক ঠিক রেখে নতুন কৌশল হিসেবে পরিবর্তন করা হয় এর নাম। যা বর্তমানে ‘মিরপাড়া গেস্ট হাউজ’ নাম দিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে।
বর্তমানে ‘মিরপাড়া গেস্ট হাউজ’এ পুরাতন কিছু কর্মচারী বা দালাল বদলীয়ে নতুন করে রাখা হয়েছে। আর এসকল দালালদের দিয়েই জয় খান তার অবৈধ বাণিজ্য চলমান রেখেছেন।
ছদ্মবেশে ‘মিরপাড়া গেস্ট হাউজ’এর দালালদের সঙ্গে খদ্দের হিসেবে কথা হলে তারা বলেন, আপনি নিশ্চিন্তে এখানে আসতে পারেন। আমরা সকল নিরাপত্তা দিয়ে ব্যবসা করি। নির্বাচিত কোনো সরকার নাই, তাই পুলিশেও কোনো ঝামেলা করেনা। মাদক পাওয়া যাবে কিনা এ প্রশ্নের জবাবে দালাল বলেন, ইয়াবা সহ টাকা দিলেই যে কোন নেশা পাবেন। (ফোন কল রেকর্ড দৈনিক রাষ্ট্রীয় সংবাদ পত্রিকার কাছে সংরক্ষিত)।
উক্ত ‘মিরপাড়া গেস্ট হাউজ’এর দালালেরা হলেন- (১) এনামুল ভাই যার মোবাইল নাম্বার-০১৭৮৪-১১১৪০২, (২)মিন্টু ভাই-০১৮১৭-৬৯৬৯৯৫, (৩) সজীব ভাই-০১৮৬৬-৭০৮২৮৯, (৪) জাহাঙ্গীর ভাই-০১৯৯২-১৮৬৭৫৩ (৫) পারভেজ (ক্যাশিয়ার)-০১৯৭৩-২০০৬৯৪ সহ আরো অনেকেই। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
উক্ত বিষয়ে কালাম হোসেন (ওরফে- জয় খান)এর কাছে সত্যতা জানতে চাইলে তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার ০১৭১৬-২৭৯৫৯৪ এ ফোন কল করলে তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ভাই আমি এখন এধরনের কোনো ব্যবসা করি না। আপনারা চাইলে আমার হোটেলে সিসিক্যামেরা লাগাতে পারেন। বলে ফোন কলটি কেটে দেন উক্ত জয় খান।
তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায়, জয় খানের কথার ভিন্ন রূপ। গেস্ট হাউজটির গেটের সামনে তালা ঝুলছে ঠিকই কিন্তু খদ্দের আসলে গেটের তালা খুলেদেন ভিতরে থাকা কর্মচারীরা। আর তালাবদ্ধ অবস্থাতেই ভেতরে রাখা হচ্ছে পতিতাললনাদের। এভাবেই চলছে তাদের দেহ ব্যবসা ও মাদকের বাণিজ্য।
জেলা প্রশাসকের কার্যলয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এধরনের গেস্ট হাউসগুলোর নেই কোন অনুমোদন। অনুমোদনহীন গেস্ট হাউসটি শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স ও কোনমতে বিল্ডিং ভাড়া নিয়ে ঝলমলে আলোয় সাজানো সাইনবোর্ড লাগিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত মাদক ও রমরমা পতিতা বাণিজ্য চালিয়ে আসছে। শুধু তাই নয় এসব গেস্ট হাউসগুলো ডিএমপি’র বিধি নিষেধ অমান্য করেই দেদারসে চলছে অসামাজিক কার্যকলাপ।
রাষ্ট্রের অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরশাসক সরকারের রেখে যাওয়া নেতা-কর্মীরাই বিভিন্নভাবে সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য দেশের প্রচলিত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত হওয়ার চেষ্টায় রয়েছে তারা। এতে করেও দেশে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এসকল অবৈধ হোটেল বা গেস্ট হাউজের গোপন কক্ষে মাদক সেবন ও পতিতাবৃত্তি হয় তা সমাজে অপরাধ প্রবণতাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। অবশ্যই এদের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হস্পক্ষেপ প্রয়োজন।
এদিকে মিরপাড়ায় বসবাসকারী স্থানীয় এলাকাবাসীরা অভিযোগ করে বলেন, হোটেলটিতে প্রতিনিয়ত সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেশাগ্রস্থ লোকদের হোটেল থেকে নামতে দেখা যায়। এতে আমাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্কুল-কলেজে যাতায়াতে অনেক ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় প্রায়ই।
এছাড়াও ফুটপাতে অমক ভাই তমক ভাইদের কার্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। এসমস্ত অবৈধ হোটেল ব্যবসায়ীদের কারণে আমরা আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকি।
এলাকাবাসীরা বলেন, হোটেল মালিকরা এলাকার কিছু পাতি নেতাদের ম্যানেজ করে এধরনের ব্যবসা চালিয়ে আসছে। সেই সাথে গেস্ট হাউজটিতে অবৈধ কার্যকলাপ বন্ধে পুলিশ প্রসাশনের সঠিক হস্তক্ষেপ কামনা করেন সচেতন এলাকাবাসীরা।
চলবে…